
জি,এম,ফিরোজ, ডুমুরিয়া
শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই আনন্দ, নতুন পোশাক আর উৎসবের আমেজ। কিন্তু সেই আনন্দের ছোঁয়া লাগেনি খুলনার রংপুর ঘরামিবাড়ির তিন অসহায় বোনের জীবনে। ঘরে নেই একমুঠো চাল, নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্যও নেই। কখনো মুড়ি খেয়ে, কখনো দিনে একবেলা ভাত খেয়ে কাটছে তাঁদের দিন। চারদিকে যখন উৎসবের আলো, তখন তাঁদের চোখে কেবলই অশ্রু আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা।তাঁরা হলেন রংপুরে’র মৃত স্বাধীন বৈরাগীর তিন কন্যা নিমালা বৈরাগী (৭২), বিমালা বৈরাগী (৬৮) ও মুক্তেশ্বরী বৈরাগী (৫০)। তিন বোনই বসবাস করেন তাঁদের বাবার বাড়িতে। বড় দুই বোনের বিয়ে হলেও তাঁরা অনেক আগেই স্বামী পরিত্যক্ত হয়েছেন। তাঁদের কোনো ভাই নেই,নেই কোন সন্তান । বাবার মৃত্যুর পর থেকেই অভাব-অনটনের সঙ্গে শুরু হয় তাঁদের কঠিন জীবনসংগ্রাম। বর্তমানে শিরীষগাছের ভাইরাস বিক্রি করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন তাঁরা।
বাবার মৃত্যুর পর বদলে যায় তিন বোনের জীবনজানা গেছে, তিন বোনের বাবা স্বাধীন বৈরাগী ২০২০৬ইং সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জীবিত অবস্থায় তিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে সংসার চালাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তিন মেয়ের জীবনে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। নিজেদের ভরণপোষণের দায় কাঁধে নিয়ে শুরু হয় তাঁদের বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই।সংসার চালাতে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন বড় দুই বোন। বিমালা বৈরাগী বয়সের ভার উপেক্ষা করে রংপুর ঘরামিবাড়ি, তাতালডাঙ্গা, শলুয়া ও কালীবাড়িসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরুর দুধ কিনে পায়ে হেঁটে দৌলতপুরের মীনাক্ষী সিনেমা হলের সামনের দুধের বাজারে বিক্রি করতেন। সেই সামান্য আয় দিয়ে তিনি একটি ছোট বাড়ি তৈরি করেন। অন্যদিকে, বড় বোন নিমালা বৈরাগী গ্রামের বিভিন্ন মানুষের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালানোর চেষ্টা করেছেন।ছোট বোন মুক্তেশ্বরী বৈরাগী জীবিকার তাগিদে সিলেটের একটি ক্যানসার হাসপাতালে চাকরি করতেন। সামান্য বেতনে পেটের দায় মেটানোই ছিল তাঁর প্রধান সংগ্রাম। জানা গেছে, বড় দুই বোন নিজেরা অভাব-অনটনে থেকেও ছোট বোনকে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছেন। নিজেদের কষ্টের মধ্যেও ছোট বোনের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা।শিরীষগাছের ভাইরাস বিক্রি করেই চলে সংসার তাও বর মাএ কয়েক দিন চলবে।বর্তমানে বাবার বাড়িতে বসবাসরত তিন বোনের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন শিরীষগাছের ভাইরাস বিক্রি। এই সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করেই কোনোমতে দিন কাটছে তাঁদের। কিন্তু সেই আয়ে নিয়মিত খাবার জোগাড়, পোশাক কেনা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। আগামী দিনগুলোতে কীভাবে চলবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা তিন বোন।কাপড়ের অভাব, অসুস্থ ছোট বোনের ওষুধ কেনার টাকাও নেইসম্প্রতি বুধবার সন্ধ্যায় তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দারিদ্র্যের নির্মম চিত্র। কাপড়ের অভাবে বিমালা বৈরাগী গায়ে গামছা জড়িয়ে ছিলেন। বড় বোন নিমালা বৈরাগী ঘরের এক কোণে মশার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পুরোনো কাপড় পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করছিলেন। ছোট বোন মুক্তেশ্বরী বৈরাগী ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের সমস্যায় ভুগছেন। অর্থাভাবে ওষুধ কিনতে না পারায় অসুস্থ শরীর নিয়ে ঘরের এক পাশে শুয়ে ছিলেন তিনি।তিন বোনের জীবনে এখন প্রতিটি দিনই যেন বেঁচে থাকার যুদ্ধ। কোনো দিন মুড়ি খেয়ে, কোনো দিন একবেলা ভাত খেয়েই দিন পার করতে হচ্ছে তাঁদের। শারদীয় দুর্গাপূজায় নতুন কাপড় কেনা তো দূরের কথা, নিয়মিত খাবার জোগাড় করাই তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।বিলডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত এলাকার মানুষস্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিলডাকাতিয়া বিল দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ থাকায় ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে আশপাশের বহু পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। জীবিকার তাগিদে কেউ শাপলা, কেউ কলমিশাক, আবার কেউ কচুর পাতা সংগ্রহ করে দিন পার করছেন। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।জনপ্রতিনিধির সহায়তার আশ্বাসতিন বোনের দুর্দশার বিষয়ে ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সমারেশ মণ্ডলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “তাঁদের আমি ভালোভাবে চিনতে পারলাম না। তবে খোঁজখবর নিয়ে তাঁদের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করব।”তিন বোনের বয়স, আর্থিক দুরবস্থা ও অসুস্থতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের জন্য দ্রুত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের খাদ্যসহায়তা, চিকিৎসা এবং প্রযোজ্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।পূজার আনন্দ নয়, তাঁদের চাওয়া দুমুঠো খাবারউৎসবের দিনে অন্যরা যখন নতুন পোশাক পরে আনন্দে মেতে উঠবেন, তখন নিমালা, বিমালা ও মুক্তেশ্বরীর কাছে সবচেয়ে বড় চাওয়া—নিয়মিত খাবার, পরার মতো কাপড় এবং অসুস্থ ছোট বোনের চিকিৎসা।বাবার মৃত্যুর পর নিজেদের বাবার বাড়িতে বসবাস করে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে চলা এই তিন বোন এখন সরকারি সহায়তা ও সমাজের মানবিক মানুষের সহযোগিতার অপেক্ষায় রয়েছেন।স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, সমাজসেবী সংগঠন ও বিত্তবানদের প্রতি তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে। উৎসবের আনন্দ যেন তাঁদের মতো অসহায় মানুষের কাছেও পৌঁছায়—সেই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।শিরীষগাছের ভাইরাস বিক্রি করে আর কত দিন চলবে তিন বোনের জীবন? তাঁদের ঘরে কবে ফিরবে স্বস্তি, কবে মিলবে দুবেলা খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তাঁদের প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়—প্রয়োজন বাস্তব সহায়তা, চিকিৎসা এবং নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
